Home / ধর্ম / ইসলামের আলোকে স্বপ্ন ও এর ব্যাখ্যা পর্ব-২

ইসলামের আলোকে স্বপ্ন ও এর ব্যাখ্যা পর্ব-২

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুমিনের স্বপ্ন নবুওয়াতের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ)।

রাসূল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়:

আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে বহুজনকেই এই সৌভাগ্য দান করেছেন যে, তারা স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন। এটি অনেক বড় নেয়ামত ও সৌভাগ্যের বিষয়। তবে এ বিষয়ে আমাদের বুজুর্গদের চিন্তাধারায় ভিন্নতা রয়েছে। কারো কারো দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এ সৌভাগ্য অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। এজন্য এমন আমল করা উচিত, যার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত লাভ হয়। এর জন্য বুজুর্গানে দ্বীন বিশেষ বিশেষ আমলও উল্লেখ করেছে। যেমন, জুমার রাতে এতবার দরুদ শরিফ পাঠ করার পর অমুক আমল করে নিদ্রা গেলে আশা করা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখবে। এ ধরনের অনেক আমল প্রসিদ্ধ আছে।

রাসূল (সা.)-কে দেখার যোগ্যতা কোথায়:

কোনো কোনো বুজুর্গের চিন্তাধারা এরচেয়ে ভিন্ন। মুফতি শফী (রহ.) কাছে একব্যক্তি আসতেন। একবার তিনি শফী (রহ.)-কে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামকে দেখার আমার অনেক আগ্রহ। আমাকে কোনো আমলের কথা বলুন যাতে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখার এই নেয়ামত লাভ করতে পারি।

উত্তরে শফী (রহ.) বলেন- ভাই, তুমি অনেক উচ্চাকাক্সক্ষী। তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার আকাক্সক্ষা করছ। আমার এত সাহস নেই যে, আমি এই আকাক্সক্ষা করি। কারণ আমি কোথায় আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত লাভে ধন্য হওয়ার বিষয়টি কোথায়? তাই এই ধরনের আমল শিখার কোনো সুযোগ হয়নি। কখনো এ ধরনের আমল শিখার চিন্তাও মনে উদয় হয়নি। কারণ যদি সাক্ষাত হয়ে যায় তাহলে তাঁর আদব, তাঁর হক ও দাবি কীভাবে পূরণ করব? তাই নিজ থেকে কখনো এই সৌভাগ্য হাসিলের চেষ্টা করিনি। তবে আল্লাহ তায়ালা কখনো যদি নিজ দয়ায় তাঁর সাক্ষাত দান করেন তাহলে এটা তাঁর অনুগ্রহ। যদি তিনি নিজেই সাক্ষাত দান করেন তাহলে তার আদবেরও তিনি তাওফিক দান করবেন। কিন্তু নিজ থেকে আমার সাহস হয় না। অবশ্য একজন মুমিনের হৃদয়ে যেরূপ আকাক্সক্ষা থাকে, আমার হৃদয়েও তদ্রুপ আকাক্সক্ষা আছে। কিন্তু স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার চেষ্টা করা, এটা আমার কাজ না। এটা উঁচু হিম্মতওয়ালা লোকদের কাজ।

জাগ্রত অবস্থার আমলই আসল ভিত্তি:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সুন্নতের অনুসরণই প্রকৃত সম্পদ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এ সম্পদ লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। জাগ্রত অবস্থায় তাঁর সুন্নতের ওপর আমল হওয়াই প্রকৃত নেয়ামত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যিকার নৈকট্য লাভের এটাই মাধ্যম। কিন্তু সুন্নতের ওপর আমল নেই অথচ রওজায়ে আকদাসের গ্রিলের সঙ্গে একেবারে লেগে দাঁড়িয়ে আছে এবং জিয়ারতের চেষ্টা করছে, আমাদের দৃষ্টিতে এটি বড় দুঃসাহসিকতা। তাই সুন্নতের অনুসরণ হচ্ছে কি না এটা দেখাই প্রথম কর্তব্য। স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখা মুখ্য হওয়া উচিত না বরং জিন্দেগিতে তাঁর সুন্নত কতটা পালিত হচ্ছে সে ফিকির করা উচিত। অবশ্য যদি স্বপ্নে জিয়ারত নসিব হয় তাহলে এটা আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। তবে এটা পরকালে মুক্তির মানদণ্ড না। কারণ এটি স্বপ্নদ্রষ্টার অনিচ্ছাকৃত বিষয়।

আমাদের সমাজে কিছু লোক আছে, যারা সর্বদাই চিন্তা করে, যদি কোনো ভালো স্বপ্ন দেখতাম তাহলে খুব ভালো হত। অথচ তাদের এ ভাবনা সঠিক না। কারণ কখনো নিজের সম্পর্কে ভালো কোনো স্বপ্ন দেখলে তারা মনে করেন, আমি তো অনেক ঊর্ধে উঠে গেছি। মনে রাখবে, স্বপ্ন খোদ স্বপ্নদ্রষ্টার কোনো মর্যাদা বৃদ্ধি করে না এবং এর মাধ্যমে কোনো সাওয়াবও লাভ হয় না। জাগ্রত অবস্থার আমলই প্রকৃত মাপকাঠি।

ভালো স্বপ্ন যেন ধোঁকায় না ফেলে:

যদি কোনো ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে, আমি জান্নাত ঘুরে বেড়াচ্ছি। জান্নাতের বাগ-বাগিচা এবং মহলগুলো ঘুরে-ফিরে দেখছি তাহলে এটি বড় ভালো সুসংবাদ! কিন্তু এর কারণে এই ধোঁকায় পড়া উচিত না যে, আমি তো জান্নাতি হয়ে গেছি। তাই এখন আমার কোনো আমল করার কিংবা চেষ্টা-পরিশ্রম করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং কোনো ব্যক্তি যদি ভালো স্বপ্ন দেখার পর আমলে আরো মনোযোগী হয় তাহলে বুঝতে হবে, স্বপ্নটি ভালো, সত্য ও সুসংবাদবাহী ছিল। কিন্তু আল্লাহ না করুন, কেউ ভালো স্বপ্ন দেখার পর যদি আমল ছেড়ে দেয় এবং আমলের প্রতি তার মাঝে উদাসীনতা দেখা দেয় তাহলে এর অর্থ হলো, স্বপ্ন তাকে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে।

কোনো বিষয়ে স্বপ্নে রাসূল (সা.) এর আদেশ পাওয়া:

কেউ যদি স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে এবং তিনি এমন কোনো কাজের নির্দেশ দেন, যা শরীয়তসম্মত। উদাহরণত, ফরজ কিংবা ওয়াজিব কিংবা সুন্নত কিংবা মোবাহ কোনো কাজের আদেশ দিলেন তাহলে তা গুরুত্বের সঙ্গে করা উচিত। কারণ যে কাজ শরীয়তের আওতাভুক্ত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার নির্দেশ দিচ্ছেন, এর অর্থ হলো স্বপ্নটি সত্য এবং সেই কাজ করা তার জন্য উপকারী। যদি কাজটি সে না করে, সেক্ষেত্রে অনেক সময় বরকতশূন্যতা দেখা দেয়।

স্বপ্ন শরীয়তের দলিল নয়:

কিন্তু স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম যদি এমন কোনো নির্দেশ দেন, যা শরীয়তের আওতাভুক্ত না বরং শরীয়তের বাহ্যিক বিধি-বিধানের আওতাবহির্ভূত তাহলে সেই কাজ করা জায়েজ হবে না। কারণ আমাদের দেখা স্বপ্নকে শরীয়তের বিধানাবলী বা মাসায়েলের ক্ষেত্রে দলিল প্রমাণরূপে গ্রহণ করা হয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের যেসব বাণী নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছেছে তা শরীয়তের দলিল। তার ওপর আমল করা জরুরি। স্বপ্নে নির্দেশিত বিষয়ের ওপর আমল করা জরুরি না। কারণ যদিও শয়তান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক সুরত ধারণ করতে পারে না কিন্তু অনেক সময় স্বপ্নদ্রষ্টার ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা স্বপ্নের সঙ্গে গুলিয়ে যায়। তাই অনেক সময় স্বপ্নে নির্দেশিত বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝার ক্ষেত্রে ভুল হয়। কিংবা পরিপূর্ণ রূপে স্মরণ থাকে না। তাই আমাদের স্বপ্ন হুজ্জত তথা শরীয়তের দলিল না।

একটি আশ্চর্য ঘটনা:

জনৈক কাজি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। একবার তার কাছে একটি মামলা এলো। মামলার বাদী-বিবাদীর সাক্ষ্য উপস্থাপিত হলো। শরীয়তসম্মত পন্থায় সাক্ষীদের যাচাই-বাছাই করা হলো। অবশেষে কাজি বাদীর পক্ষে রায় দেয়ার মনস্থির করলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাজি বললেন, এ মামলার রায় আগামীকাল ঘোষণা করা হবে। তিনি ভাবলেন, কাল পর্যন্ত আরেকটু ভেবে নিই। কিন্তু রাতে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেন। সকালে জাগ্রত হওয়ার পর তার মনে হলো স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন, তুমি যে রায় দেয়ার ইচ্ছা করেছ তা সঠিক না। বরং এই রায় দেয়া উচিত। কিন্তু তিনি খুব চিন্তা-ভাবনা করে দেখলেন, যে পন্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রায় দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তা কোনোভাবেই শরীয়তের নির্দেশের সঙ্গে মিলে না। তিনি খুব পেরেশান হলেন। একদিকে শরীয়তের নির্দেশ অনুসারে রায় একরকম হয়। কিন্তু অন্যদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অন্যরকম। বিষয়টি তার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মামলার রায় দেয়া সত্যিই কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই রাতের ঘুমও হারাম হয়ে যায়। যারা এ দায়িত্ব পালন করেছেন বিষয়টির মর্ম তারাই সঠিক বুঝবেন।

কাজি সে যুগের খলিফার কাছে গিয়ে বিষয়টি খুলে বললেন। এরপর খলিফাকে অনুরোধ করলেন, আপনি ওলামাদেরকে ডেকে এ বিষয়ে তাদের পরামর্শ নিন। সেমতে দেশের বড় বড় আলেমদেরকে দরবারে ডেকে পুরো বিষয়টি পেশ করা হলো। তাদের মতামত জানতে চাওয়া হরো। ওলামারা বলেন, বাস্তবেই ঘটনাটি খুব স্পর্শকাতর। শয়তান যেহেতু স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক সুরত ধারণ করতে পারে না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের ওপরই আমল করা উচিত। উপস্থিত ওলামাদের মধ্যে হজরত শায়েখ ইজ্জুদ্দীন ইবনে আবদুস সালামও উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেযুগের প্রখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। তাকে তার শতাব্দীর মুজাদ্দিদ বলা হত। তিনি দাঁড়িয়ে বলেন, আমি পূর্ণ দৃঢ়তা ও আস্থার সঙ্গে বলছি যে, শরীয়তের নীতিমালার আলোকে আপনি যে রায় দিতে যাচ্ছিলেন, সে রায়ই প্রদান করুন। কোনো গুনাহ হলে তা আমার ওপর বর্তাবে। স্বপ্নের নির্দেশের ওপর রায় দেয়া জায়েজ নেই। কারণ স্বপ্নের মাঝে হাজার রকমের সম্ভাবনা থাকতে পারে। আপনার মনের কোনো কথা স্বপ্নের সঙ্গে মিশে গেছে কিনা আল্লাহই জানে। যদিও স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক সুরত শয়তান ধারণ করতে পারে না কিন্তু হতে পারে জাগ্রত হওয়ার পর শয়তান কোনো কুমন্ত্রণা দিয়েছে। ফলে আপনার মনে ভুল বিষয় উদয় হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে জাগ্রত অবস্থায় শোনা বাণীসমূহের বিপরীতে আমাদের স্বপ্নকে শরীয়ত হুজ্জত সাব্যস্ত করেনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব বাণী সনদ-পরম্পরায় আমাদের কাছে পৌঁছেছে, সেগুলোই আমাদের জন্য হুজ্জত। তার ওপরই আমল করা আমাদের কর্তব্য। আপনিও তার ওপর আমল করুন। গুনাহর সব দায়ভার আমার ওপর ছেড়ে দিন। চলবে…

ডেইলি বাংলাদেশ

About Johir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কোরআন শিক্ষার আসর, প্রতিদিন ৫ আয়াত

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আমরা মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন ...

সরকারের অনুদান পেলো ৩৫৯ মাদরাসা

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোর মতো কওমি মাদরাসাগুলোও বন্ধ রয়েছে। ...