Home / এক্সক্লুসিভ ডেস্ক / একজন পাপুল ও আমাদের লজ্জা

একজন পাপুল ও আমাদের লজ্জা

একজন সাংসদের ক্ষমতা অনেক। তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ হলে সমাজের আবর্জনা দূর করে পরিচ্ছনতার চাদরে মুড়িয়ে দিতে পারেন একটা সমাজকে। জনগণের সেবা করার এমন সুযোগ অন্যরা খুব একটা পায় না। একজন সাংসদ জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে গিয়ে কথা বলবেন এটাই তো হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা দেখছি তার উল্টা চিত্র। দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশে যখন একজন সাংসদকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় তার অপকর্মের জন্য তখন শুধু একজন সাংসদ আপমানিত হয় না সেই সাথে দেশের ভাবমূর্তি ও নষ্ট হয়। কারন বিদেশে তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। লাল-সবুজের পতাকা বাহক একজন প্রতিনিধি।

শহীদ ইসলাম পাপুল লক্ষ্মীপুর থেকে (স্বতন্ত্র প্রার্থী) নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটুকু সঠিক ছিল তা আজ জনতার সামনে বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার অপকর্মের জন্য। প্রচলিত আছে তিনি টাকার জোরে চেয়ার কিনেছেন,সেই চেয়ারে বসে ক্ষমতাকে হাতের পুতুল বানিয়ে রাজনীতিকে বানিজ্যের জাহাজে ভাসিয়েছেন। একজন শীর্ষ মানব পাচারকারী হিসাবে কুয়েতে তার বিচার হচ্ছে। তিনি বর্তমানে কুয়েতের জেলহাজতে আছেন। তার ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করেছে কুয়েত সরকার।

রাজনীতির বাজারে শুধু পাপুল ক্ষমতার চেয়ার কিনেছেন তা নয়,সাথে তার স্ত্রীকে ও সংরক্ষিত আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। কুয়েতে পাপুলকে যখন গ্রেফতার করা হয় একজন শীর্ষ মানব পাচারকারী হিসাবে তখন তার স্ত্রী সাংসদ হিসাবে সংসদের প্যাড ব্যবহার করে লিখেছিলেন এসব তার স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অচিরেই সত্য বেরিয়ে আসবে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তিতে আমরা দেখি তিনি মিথ্যার জাল বিছিয়েছেন স্বামীকে বাঁচানোর জন্য।

প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতির পথে না হেঁটে, রাজপথে সংগ্রাম না করে একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি কিভাবে ক্ষমতার চেয়ার দখল করল ? যারা তাকে এ সুযোগ দিয়েছে তারা কি দায়ী নয়? একজন ব্যক্তি কখনোই একা অপরাধ করতে পারে না যদি না তার আশেপাশের লোকগুলো সহযোগিতা না করে। অনেকে দীর্ঘদিন রাজপথে থেকে রাজনীতির ছত্রছায়ায় থেকে কোন পদ পায় না। কর্মিরা তাদের জীবনের একটা অংশ বিলিয়ে দেয় তবুও কোন পদবী কপালে জুটেনা। শুধু টাকার জোরে অরাজনৈতিক ব্যক্তি, মানবপাচারকারী, অসৎ একজন লোক সংসদের মত চেয়ারে বসতে পারে, আইন প্রনেতা হয় এ আমাদের জন্য লজ্জার।

পাপুল বিদেশের পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছেন তার অপকর্মের জন্য। নিজে তো ডুবেছেন, দেশকে ও ডুবিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই একদিনে এসব অপকর্ম সাথে জড়িত না? দির্ঘদিন থেকেই মানব পাচার করে আসছেন। তার সহযোগি কারা ? কারা তাকে সাপোর্ট করছে। একজন সাংসদ দেশের সম্মান বিকিয়ে দিয়ে এভাবে দিনের পর দিন অবৈধভাবে কাজ করে যাচ্ছে আর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্নধাররা জানে না। আজব তো? জানে না তা কি করে হয় , বরং জেনেই তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি এমনি হওয়ার কথা।

দেশের অভ্যন্তরে যখন আইন নিজের গতিতে চলে না,তখন অপরাধী পার পেয়ে যায়। কিন্তু বিদেশ তো সেরকম নয়। সেখানে আইনের শাসন থাকে। ফলে একবার,দুইবার অপরাধ করে পার পেলেও ধরা তাকে পড়তে হয়। পাপুল হয়ত ভেবেছে কি আর হবে? টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করে ফেলবে। হয়ত অতীতে করেছিল। কিন্তু বাংলায় একটা প্রবাদ আছে “বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান,এবার ধরা পড়ে গেছ ওরে সোনার চান”। জনপ্রতিনিধি হওয়া সহজ বিষয় নয়। পাপুল যেহেতু রাজনৈতিক ব্যকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা ব্যক্তি না সে ক্ষেত্রে রাজনীতির দায়িত্ব, মর্যাদা, সম্মান এগুলো তার কাছে তুচ্ছ হবে সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল এখানেই । আমরা নিবেদিত পেশাদার রাজনীতিবিদের পথটা বন্ধ করে টাকার বিনিময়ে পাপুলদের মত লোকদের সংসদে পাঠাই। তাদের কাছ থেকে ভালো আর কি আশা করতে পারি। এর জন্য আমরাও অনেকাংশে দায়ী। সরাসরি না হলে পরোক্ষভাবে হলে দায়ী। তাই তারা দেশের সম্মান নষ্ট করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

এই পাপুলের কারণে শুধু যে দেশের সম্মান নষ্ট হল তা নয়, প্রবাসে বিভিন্ন দেশে থাকা আমরাও বিব্রত। বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশী কুয়েতে আছে তাদের বাঁকা চোখে তাকাবে অন্যরা। দশ-বারো ঘন্টা কাজ করে রেমিটেন্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতি মজবুত করে আর পাপুলের মত লোকের কারণে মাথা হেট হয়ে যায়। কিছু বিষয় থাকে অলিখিত। অর্থাৎ সরাসরি আক্রমনের শিকার হয় না, তবে কাজের ক্ষেত্রে গেলে সমস্যাটা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। কুয়েতে যেসব দেশী ভাইয়েরা আছে তারাও এমন সমস্যার সম্মুখীন হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। প্রবাসে একজন শ্রমিক দেশের কথা ভাবে, পরিবারের কথা ভাবে, সম্মানের কথা ভাবে কারন তারা উপার্জন করে সৎ ভাবে। তাদের প্রতিটি ঘামের সাথে উপার্জনের অর্থ জড়িত। অবৈধভাবে উপার্জিত শত কোটি টাকার মালিক পাপুলরা সেটা অনুধাবন করতে পারবে না। তারা নিজের স্বার্থের জন্য বরং রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাত করে।

দেশের একজন সাংসদ যখন বিদেশের জেলে থাকে তার অপকর্মের দায় শুধু তার না, রাষ্ট্রেরও। কারণ, দেশের আইন ফাঁকি দিয়ে যে মানবপাচার করে যাচ্ছে আর রাষ্ট্র তাকে ধরতে পারছে না,এটাও রাষ্ট্রের জন্য একটা ব্যর্থতা। কুয়েতে এখন শুধু পাপুলের নাম উচ্চারিত হচ্ছে না, দেশের নামটাও তার সাথে উচ্চারিত হচ্ছে। বহিঃবিশ্বের মানুষ দেখছে যে একজন সাংসদ হয়ে কিভাবে মানব পাচারের সাথে জড়িত। প্রযুক্তি কারনে খবর এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। মুহূর্তেই পৌঁছে যায় সারাবিশ্বে। পাপুলের মত লোকেরা সংবাদের শিরোনাম হয় বিদেশে আমরা তাকিয়ে দেখি ,লজ্জা হয় আমাদের। মনে এই কি আমাদের গণতান্ত্রিক দেশ ? এই কি আমাদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন করা দেশ? যে দেশ নিয়ে আমরা গর্ব করি, যে ইতিহাস নিয়ে আমরা মাথা উঁচু করে কথা বলি. সে দেশের একজন সাংসদের এমন অসততা দেখে লজ্জা পাই। নিউ জার্সি থেকে

About Johir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এবার খাগড়াছড়িতেও বাড়ল পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কক্সবাজারের পর এবার খাগড়াছড়িতেও সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ ...

যশোর-৬ উপ-নির্বাচন স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট দেয়ার আহ্বান সিইসির

যশোর-৬ কেশবপুর আসনের উপ-নির্বাচনে ভোটারদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান ...